নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান শাখার এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে পড়াচ্ছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সায়েন্স একাডেমির সহায়তায় দেশব্যাপী অনলাইনে এ কার্যক্রম চালাচ্ছে দেশের নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের ১০০ নেতা-কর্মীর একটি দল।
গত অক্টোবরে শুরু হওয়া এ শিক্ষা-সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় করছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপ-বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার হাবীব আহসান।

তিনি জানিয়েছেন, তাদের এই উদ্যোগে প্রতিদিনই নতুন নতুন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক যুক্ত হচ্ছেন। করোনার এই দুর্যোগে এমন উদ্যোগে যুক্ত হতে পেরে তারা উভয় পক্ষই খুশি।

খন্দকার হাবীব আহসান বলেন, ‘শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির এই সংগঠন নিয়ে গর্বের অনেক কিছুই থাকলেও নেতিবাচক কথাবার্তাই বেশি হয়। আমি চাইছিলাম এই অপপ্রচার বন্ধ করে ইতিবাচক কিছু করতে। করোনার এই দুর্যোগ আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। বিনা মূল্যে সারা দেশের নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে পড়াতে পারছি। যারা পড়াচ্ছেন সবাই ছাত্রলীগের।’

তিনি জানান, গত বছরের অক্টোবর মাসে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সায়েন্স একাডেমির সহায়তায় ১৫ জন অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে নিয়ে বিনা মূল্যের এই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এ বছরে করোনা সংক্রমণ বাড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সময় বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন উদ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এখন সব মিলিয়ে এ কার্যক্রমে রেজিস্ট্রেশনকৃত নিয়মিত শিক্ষার্থী ১ হাজার ৬৮ জন। যাদের ১০০ জনের শিক্ষক প্যানেলের মধ্যে অন্তত ৬৩ জন শিক্ষক নিয়মিত পড়াচ্ছেন। রেজিস্ট্রেশন চলবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলা পর্যন্ত। করোনা সংক্রমণ কমে গেলেও ছাত্রলীগের বিনা মূল্যের এই শিক্ষা-সহায়তা চলবে।

উপ-বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক হাবীব বলেন, ‘অতি স্বল্প সময়ে আমাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে তিন-চারটি ব্যাচে ৮০-১০০ জন শিক্ষার্থী নতুন করে সহায়তাটি নিতে যুক্ত হচ্ছেন। প্রত্যেক শিক্ষক ১৫-২০ জনের একেকটি গ্রুপকে সপ্তাহে ন্যূনতম দুই দিন পদার্থ, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান, আইসিটি, ইংরেজি বিষয়ে জুম এবং গুগল মিটের মাধ্যমে ক্লাস নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি স্বেচ্ছেসেবী কার্যক্রম।’

তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট, চুয়েট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ, রাঙ্গামাটি মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বিনা মূল্যে এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। রাশিয়া-কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও এই কাজে যুক্ত আছেন। দেশের আটটি বিভাগেরই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে পড়ছেন।

সহায়তা কার্যক্রমটি পেতে বা কার্যক্রমটির সঙ্গে যুক্ত হতে যোগাযোগ করতে হবে ০১৭৪০০০০০৭৫ বা ০১৯৭১৪৮৫২৬৬ নম্বরে। অথবা Fb/DrMAW azedMiahSA ফেসবুক পেজ এবং drmawazedmiahscienceacademy@gmail.com ই-মেইল ঠিকানার মাধ্যমেও এতে যুক্ত হওয়া যাবে।
খন্দকার হাবীব আহসান বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থায় বাণিজ্য প্রতিরোধ করতে স্কুল-কলেজের বাইরে শিক্ষা বিনিময়ের মাধ্যমটি বাণিজ্যিক কোচিংনির্ভর না হয়ে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম হোক, এটাও প্রত্যাশা। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এ দেশের যেকোনো সংকটে আগের মতো সময়োপযোগী কাজ করে সংকট মোকাবিলা করবে, এটাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক শিক্ষা, এটাই দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশনা।’

বিনা মূল্যের এই অনলাইন ক্লাস করছেন রাজধানীর নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি দুই-তিন মাস আগে এক বন্ধুর মাধ্যমেই এই ক্লাসের খবর পাই। তারপর থেকে জুম বা গুগল মিটে এই ক্লাস করছি। বায়োলজি, কেমেস্ট্রির যেকোনো সমস্যার সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। বন্ধুবান্ধব মিলে আমরা এক ব্যাচে ১০ জন পড়ছি। শিক্ষকরা খুবই আন্তরিক। মেসেঞ্জারে নক করেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়।’

আরিফুর রহমান বলেন, ‘এই করোনার মধ্যে এমনিতেই কোথাও বের হওয়া যাচ্ছে না। স্যার পাওয়া যাচ্ছে না। সেখানে বিনা মূল্যে অনলাইনে এমন সুবিধা দিচ্ছে ছাত্রলীগ। আমি আমার কঠিন দুটি সাবজেক্ট ঘরে বসেই শিখতে পারছি, টাকাও লাগছে না।’
রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়েছেন ছাত্রলীগের এই উদ্যোগে। তাদের একজন সাতক্ষীরার শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. কবিবুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে সাতক্ষীরা ছাত্রলীগের কিছু বড় ভাই আছেন। দেখতাম মাঝেমধ্যে তারা এই লিংক শেয়ার করতেন। এখানে বিনা মূল্যে পড়ার জন্য তারা উৎসাহ দিতেন। তাদের উৎসাহেই এই লিংকে ঢুকে বিষয়টা ভালো মনে হয়। পরে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হই। সব শিক্ষকই খুবই আন্তরিকতা নিয়ে ক্লাস করান। শিক্ষকের বাসায় গিয়ে পড়ায় যে সন্তুষ্টি আসে, এই অনলাইন ক্লাসে তার ১০০ ভাগ পূরণ না হলেও আমার যা প্রয়োজন তা মিটছে। আমি এখানে মূলত ম্যাথ আর ফিজিক্স পড়ি।’

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এই উদ্যোগে সাড়া দিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মো. রাজন হোসেন।

এ কাজে যুক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ফজলুল হক হলের এই ছাত্রলীগ কর্মী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনার সময় এমনিতেই কোনো কাজ নেই। ঘরে বসেই থাকি। ঘরে বসেই কিছু একটা করার প্ল্যাটফর্ম খুঁজছিলাম। এর মধ্যে ছাত্রলীগের বড় ভাইরা আমাকে অফার করে এখানে যুক্ত হওয়ার। বিষয়টা শুনেই আমার ভালো লাগে। আমি এর সঙ্গে যুক্ত হই। এতে আমার কোনো প্রেশার পড়ে না। কারণ, আমি যখন ফ্রি থাকি, তখনই আমার ব্যাচ দেয়। সপ্তাহে দু-তিন দিন ক্লাস নেই। এক ব্যাচে ১৫-২০ জন থাকে। আমি মূলত ফিজিক্স-কেমেস্ট্রি পড়াই।’

এখানে ক্লাস নেয়ার আগ্রহের কারণ জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এইচ এম আজরাফ নাজমী বলেন, ‘আমি ছাত্রলীগের ঢাকা মেডিক্যাল শাখার একজন কর্মী। মানুষ সব সময় ছাত্রলীগকে নেতিবাচক মনে করে। অনেক দিন ধরেই ছাত্রলীগকে নিয়ে ইতিবাচক কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল। করোনার এই সময়ে ছাত্রলীগের বড় ভাইরা যখন এ রকম একটা উদ্যোগ নেন, তখন আর বসে থাকলাম না। আমি সপ্তাহে দুই দিন শনি আর বুধবার সন্ধ্যায় ক্লাস নিই। কারণ, ওই সময় আমি ফ্রি থাকি; শিক্ষার্থীরাও পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আমার প্রত্যেক ব্যাচে ১৫-১৮ জন থাকে, তাদের মূলত বায়োলজি ও কেমেস্ট্রি পড়াই।’